রেলওয়ে সংবাদ
পঞ্চগড়-কক্সবাজার সরাসরি ট্রেন: বদলে যাবে দেশের রেল মানচিত্র
পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্ক যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এক নজরে
- পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
- পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্ক যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশের উত্তর সীমান্তঘেঁষা পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণের পর্যটননগরী কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগ দেশের রেল যোগাযোগের প্রচলিত মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্ককে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন, শান্তাহার-বগুড়া লিংক, চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্প।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব প্রকল্প সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পঞ্চগড়, রাজশাহী, চিলাহাটিসহ বিভিন্ন রুট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচল সম্ভব হবে।
বর্তমানে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ট্রেনগুলো ঢাকার দিকে যেতে ঈশ্বরদী হয়ে দীর্ঘ ঘুরপথ অতিক্রম করে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংক বাস্তবায়িত হলে এই ঘুরপথের প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমে যাবে। ফলে পঞ্চগড়, বুড়িমারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও চিলাহাটিসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটের যাত্রাপথ ছোট হওয়ার পাশাপাশি প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে ৯০১ একর ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সংশোধিত ডিপিপি পুনর্গঠন করে একনেকের অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এই করিডোরের সঙ্গে শান্তাহার-বগুড়া লিংক যুক্ত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি ব্রডগেজ রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে।
পূর্বাঞ্চলের রেলপথ উন্নয়নের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশকে ডুয়েলগেজ নেটওয়ার্কে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, দেশের রেল নেটওয়ার্ককে আরও কার্যকর করতে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন প্রকল্পও অগ্রাধিকার পেয়েছে। প্রায় ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কর্ড লাইনের মাধ্যমে কুমিল্লাকে সরাসরি রাজধানীর শ্যামপুরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব কমবে প্রায় ৮০ কিলোমিটার ও যাতায়াতের সময় কমবে দুই ঘণ্টা।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণ মানুষের যাতায়াত আরও সহজ করতে নতুন ট্রেন চালুর উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। গত ১০ আগস্ট ঢাকা-গোপালগঞ্জ-ঢাকা রুটে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেন উদ্বোধন করা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মহানগর এক্সপ্রেসের রুট কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২৬ অক্টোবর রাত ৮টা থেকে মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত চলবে।
অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি রেল পরিবহণ সক্ষমতা বাড়াতে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহেও জোর দেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী রেলকোচ সংগ্রহের প্রথম চালানে ১৮টি কোচ ইতোমধ্যে দেশে এসেছে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকা-পাবনা-ঢাকা রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালু হবে।
রেলওয়ে জানায়, রেলপথকে নিরাপদ করতে ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনের লেভেল ক্রসিংগুলো আন্ডারপাস বা ওভারপাসে রূপান্তরের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করা হয়েছে। যাত্রীসেবায় ডিজিটাল সুবিধা হিসেবে কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রেলস্টেশনে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই চালু হয়েছে।
পঞ্চগড়-কক্সবাজার সরাসরি ট্রেনের উদ্যোগটি দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্প, ডুয়েলগেজ-ব্রডগেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, নতুন রোলিং স্টক, নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সেবা—সমন্বিত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রেলওয়ে আরও সক্ষম, নিরাপদ, আধুনিক ও জনবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থায় রূপ নেবে।
সূত্র: jugantor.com