রেলওয়ে সংবাদ
অবশেষে রেলের লাগেজ ভ্যানে যাত্রী বহনের পরিকল্পনা
৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ১২৫টি লাগেজ ভ্যানের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। অব্যবহৃত ভ্যানগুলো যাত্রী পরিবহনের বগিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে রেলওয়ে।

এক নজরে
- ৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ১২৫টি লাগেজ ভ্যানের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে।
- অব্যবহৃত ভ্যানগুলো যাত্রী পরিবহনের বগিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে রেলওয়ে।
পণ্য পরিবহনের জন্য ৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কিনেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। কিন্তু কেনার পর থেকে বেশির ভাগই অব্যবহৃত পড়ে আছে। রেলওয়ের হিসাবে এসব লাগেজ ভ্যানের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে।
পণ্য পরিবহনে প্রত্যাশিত আয় না আসায় এবার সেগুলো যাত্রী পরিবহনের বগিতে রূপান্তরের চিন্তা করছে রেলওয়ে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অব্যবহৃত লাগেজ ভ্যানগুলো ফেলে না রেখে যাত্রী বহনের উপযোগী করা গেলে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এ জন্য বগিগুলোর ব্যবহার পরিবর্তন করে লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
১৩ অক্টোবর রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পরিদর্শন করেন। এ সময় রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও রেলসচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শনের সময় লাগেজ ভ্যানগুলো যাত্রী পরিবহনের বগিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন রেল কর্মকর্তারা।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় ব্যবস্থাপক শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সম্প্রতি রেলমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কারখানা পরিদর্শনে এলে লাগেজ ভ্যানগুলো যাত্রী পরিবহনে ব্যবহারের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। কীভাবে বগিগুলো রূপান্তর করা যেতে পারে, তা-ও দেখানো হয়েছে। এখন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাজটি করবে, নাকি বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটিও কর্তৃপক্ষ ঠিক করবে। এর আগে লাগেজ ভ্যানগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল রেলওয়ে। তবে সেই পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি।
রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান রেলওয়ের বহরে যুক্ত হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের রোলিং স্টক অপারেশন উন্নয়ন (রোলিং স্টক সংগ্রহ)’ প্রকল্পের আওতায় এগুলো কেনা হয়েছিল। ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি করে রেলওয়ে।
লাগেজ ভ্যানগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকার কারণ খতিয়ে দেখতে গত বছরের ৫ জানুয়ারি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়। সভার কার্যপত্র অনুযায়ী, রেলওয়ের ১২৫টি লাগেজ ভ্যানের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে। বাকি ৯৫ শতাংশ অব্যবহৃত থাকছে।
সভায় এক কর্মকর্তা বলেন, নীতিমালা করে বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লাগেজ ভ্যান ইজারা বা ভাড়া দেওয়া গেলে এ খাত থেকে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব। আরেক কর্মকর্তা জানান, অল্প সংখ্যক ট্রেনে লাগেজ ভ্যান যুক্ত করে পার্সেল ও নথিপত্র পরিবহন করা হচ্ছে। তবে স্টেশনে পণ্য বুকিং ও পরিবহনের ব্যবস্থা থাকলেও গ্রাহকের বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার মতো ‘ডোর টু ডোর’ সেবা দেওয়ার সুযোগ রেলওয়ের নেই।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এ সীমাবদ্ধতার কারণে পণ্য পরিবহনে লাগেজ ভ্যানের প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কম। কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের দরজায় পণ্য পৌঁছে দিতে পারে। আবার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি ট্রাক বা অন্য যানবাহনে পণ্য গন্তব্যে পাঠাতে পারেন; কিন্তু রেলে পণ্য পাঠাতে হলে প্রথমে স্টেশনে নিয়ে আসতে হয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর আবার সেখান থেকে পণ্য সংগ্রহ করে নিতে হয়।
রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, নতুন কেনা লাগেজ ভ্যানগুলো ব্যবহার করে আয় বাড়ানোর জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে পণ্য পরিবহনে রেলওয়ের সেবা নেওয়ার অনুরোধও জানানো হয়েছিল; কিন্তু তাতে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পণ্য পরিবহনে বিনিয়োগ করেও এ খাত থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব আসছে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে পার্সেল পরিবহন থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। আয় হয়েছে ৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এর একটি ছিল যাত্রীবাহী ট্রেনে লাগেজ ভ্যান যুক্ত করা, যাতে যাত্রীরা সহজে প্রয়োজনীয় পণ্য ও মালামাল পরিবহন করতে পারেন।
সে সময় রেলওয়ের বহরে ৫০টি লাগেজ ভ্যান ছিল, যার মধ্যে সচল ছিল ১৮টি। ব্রডগেজ ও মিটারগেজ লাইনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তনগর, মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেনে লাগেজ ভ্যান যুক্ত ছিল। ভবিষ্যতে চাহিদা বিবেচনায় আরও লাগেজ ভ্যান কেনার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল।
এর তিন বছর পর, ২০১৭ সালে এ জন্য প্রকল্প নেয় রেলওয়ে। পরে এডিবির অর্থায়নে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনা হয়। তবে বহরে যুক্ত হওয়ার পরও এসব ভ্যানের বেশির ভাগ কাজে লাগানো যায়নি।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বহরে থাকা যেসব লাগেজ ভ্যান কাজে আসছে না, সেগুলো যাত্রী পরিবহনের বগিতে রূপান্তরের চিন্তাভাবনা চলছে। রূপান্তরের পর বগিগুলো কমিউটার, মেইল ও লোকাল ট্রেনে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সূত্র: prothomalo.com