রেলওয়ে সংবাদ
পঞ্চগড়-কক্সবাজার সরাসরি ট্রেন: বদলে যাবে দেশের রেল মানচিত্র
উত্তরের পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণের কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের যাত্রাপথ ১১২ কিলোমিটার কমে যাবে এবং সময় সাশ্রয় হবে তিন থেকে চার ঘণ্টা।
এক নজরে
- উত্তরের পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণের কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
- পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের যাত্রাপথ ১১২ কিলোমিটার কমে যাবে এবং সময় সাশ্রয় হবে তিন থেকে চার ঘণ্টা।
দেশের উত্তর সীমান্তঘেঁষা পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণের পর্যটননগরী কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল চালুর পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে যোগাযোগের প্রচলিত মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ রেলওয়ে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্ককে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে ডুয়েলগেজ ও ব্রডগেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল যাত্রীসেবা ও পরিবেশ সুরক্ষার কর্মসূচিও সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর লক্ষ্য সামনে রেখে পশ্চিমাঞ্চলের বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংক এবং পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর লক্ষ্য নিয়ে এসব প্রকল্প সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু পঞ্চগড়ই নয়, রাজশাহী, চিলাহাটি ও অন্যান্য ব্রডগেজ রুট থেকেও কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ট্রেনগুলো ঢাকার দিকে যেতে ঈশ্বরদী হয়ে দীর্ঘ ঘুরপথ অতিক্রম করে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংক বাস্তবায়িত হলে এ ঘুরপথের প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমে যাবে। এতে পঞ্চগড়, বুড়িমারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও চিলাহাটিসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটের যাত্রাপথ ছোট হওয়ার পাশাপাশি প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য যোগাযোগে গতিশীলতা আসবে এবং রাজধানীসহ সারাদেশে কম খরচে ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পটি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের জন্য এরই মধ্যেই ৯০১ একর ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সংশোধিত ডিপিপি পুনর্গঠন করে একনেকের অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এই করিডোরের সঙ্গে শান্তাহার-বগুড়া লিংক যুক্ত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি ব্রডগেজ রেল যোগাযোগ আরো কার্যকর হবে এবং উত্তরাঞ্চল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগও তৈরি হবে।
পূর্বাঞ্চলের রেলপথ উন্নয়নের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশকে ডুয়েলগেজ নেটওয়ার্কে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের প্রকল্প এরই মধ্যে অনুমোদিত হয়েছে এবং মূল কাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে। আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন ডুয়েলগেজ প্রকল্প ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ইতিমধ্যে ডুয়েলগেজ হওয়ায় পশ্চিমাঞ্চলের ব্রডগেজ রেলপথের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের ডুয়েলগেজ নেটওয়ার্ক যুক্ত করা গেলে পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালানোর অবকাঠামোগত ভিত্তি আরো শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের রেল নেটওয়ার্ককে আরো কার্যকর করতে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন প্রকল্পও অগ্রাধিকার পেয়েছে। প্রায় ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ কর্ড লাইনের মাধ্যমে কুমিল্লাকে সরাসরি রাজধানীর শ্যামপুরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব কমবে প্রায় ৮০ কিলোমিটার ও যাতায়াতের সময় কমবে দুই ঘণ্টা। প্রকল্পের পুরো অংশই উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমাবে এবং লেভেল ক্রসিং সীমিত রেখে ট্রেনের গতি ও নিরাপত্তা বাড়াবে।
অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি রেল পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহেও জোর দেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী রেলকোচ সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় প্রথম চালানে ১৮টি কোচ ইতিমধ্যে দেশে এসেছে। এর থেকে ১২টি নতুন কোচ দিয়ে ঢাকা-পাবনা-ঢাকা রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যা নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে চালু হবে। এ ছাড়া ঢাকা-খুলনা-ঢাকা রুটে দুটি আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতিও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
যাত্রীসেবায় ডিজিটাল সুবিধাও যুক্ত হচ্ছে। কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রেলস্টেশনে বিটিসিএলের মাধ্যমে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই চালু হয়েছে। পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস ও উপবন এক্সপ্রেসেও স্টারলিংকের মাধ্যমে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালু হয়েছে। রেলওয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও উন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
পঞ্চগড়-কক্সবাজার সরাসরি ট্রেনের উদ্যোগটি দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্প, ডুয়েলগেজ-ব্রডগেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, নতুন রোলিং স্টক, নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সেবা—সমন্বিত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রেলওয়ে আরো সক্ষম, নিরাপদ, আধুনিক ও জনবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থায় রূপ নেওয়ার পথে এগিয়ে যাবে।
সূত্র: kalerkantho.com